🌿🌷 সুখবোধিনী🌷🌿
সৃষ্টির আদি রহস্য ও গোপাল-তত্ত্ব
মুনিদের প্রশ্ন
বহু যুগ আগের কথা। ব্রহ্মলোক। সৃষ্টির আদি পিতা প্রজাপতি ব্রহ্মা ধ্যানে মগ্ন। এমন সময় সনক, সনন্দ, সনাতন ও সনৎকুমার—এই চার মহাজ্ঞানী ঋষি ব্রহ্মার কাছে উপস্থিত হলেন। তাঁদের মনে এক বিরাট প্রশ্ন।
তাঁরা ব্রহ্মাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "হে পিতা! এই জগতে তো বহু দেবতা, বহু মন্ত্র। কিন্তু আপনি বলুন—কে সেই পরম দেবতা? কাকে ভজনা করলে মৃত্যুর ভয় দূর হয়? কার মন্ত্র জপ করলে সংসার-বন্ধন ছিন্ন হয়ে প্রেম লাভ হয়?"
ব্রহ্মার উত্তর ও জীব গোস্বামীর আলোকপাত
ব্রহ্মা চোখ খুললেন। তিনি বললেন, "বৎসগণ, সেই পরম তত্ত্ব নিরাকার ব্রহ্মজ্যোতিও বটে, আবার সাকারও বটে। তবে তাঁর সর্বোত্তম রূপ হলো—শ্রীকৃষ্ণ। তিনি মথুরা-বৃন্দাবনের গোপবেশধারী।"
এখানে জীব গোস্বামী তাঁর 'সুখবোধিনী' টীকায় কলম ধরলেন। তিনি বুঝিয়ে বললেন— “সাধকরা যাকে নিরাকার ব্রহ্ম বলেন, তিনি আসলে শ্রীকৃষ্ণের অঙ্গের জ্যোতি মাত্র। যেমন সূর্যের রশি আর সূর্যমণ্ডল এক হলেও সূর্যমণ্ডলই প্রধান, তেমনই শ্রীকৃষ্ণই হলেন মূল তত্ত্ব বা স্বয়ং ভগবান।”
ব্রহ্মা ঋষিদের একটি বিশেষ মন্ত্র দিলেন—১৮ অক্ষরের গোপাল মন্ত্র।
ব্রহ্মা বললেন, "যিনি গোবিন্দ, যিনি গোপীজনবল্লভ, তাঁকেই ভজনা করো।"
ধ্যানের রূপ
ঋষিরা জিজ্ঞাসা করলেন, "হে পিতা, সেই শ্রীকৃষ্ণের রূপ কেমন? আমরা ধ্যানে কী দেখব?"
ব্রহ্মা বর্ণনা করলেন—"তিনি কিশোর, তাঁর গায়ের রং মেঘের মতো শ্যামল (ঘনশ্যাম), পরনে পীতবাস (হলুদ কাপড়), গলায় বনফুলের মালা। তিনি হাতে বাঁশি নিয়ে ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর চোখ পদ্মফুলের পাপড়ির মতো।"
জীব গোস্বামী বললেন— “এই রূপ কোনো কল্পনা নয়। এটিই ভগবানের নিত্য রূপ। তিনি সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ—অর্থাৎ তাঁর দেহ সাধারণ হাড়-মাংসের নয়, তা আনন্দ ও চৈতন্য দিয়ে তৈরি।”
গোপীদের পরীক্ষা ও দুর্বাসা মুনি (উত্তর তাপনী)
যমুনার তীরে গোপীগণ
বৃন্দাবনের গোপীরা একদিন স্থির করলেন তাঁরা যমুনার ওপারে থাকা ঋষি দুর্বাসাকে ভোজন করাবেন। তাঁরা নানা সুস্বাদু খাবার তৈরি করলেন। কিন্তু সমস্যা হলো—যমুনা নদীতে প্রবল বান এসেছে। পার হওয়ার কোনো নৌকা নেই।
গোপীরা শ্রীকৃষ্ণের কাছে গিয়ে বললেন, "কানাই, আমরা ওপারে ঋষিকে খাওয়াতে যাব, কিন্তু যমুনা তো পার হতে পারছি না। উপায় বলো।"
শ্রীকৃষ্ণ মুচকি হেসে বললেন, "তোমরা যমুনার কাছে গিয়ে বলো— 'যদি কৃষ্ণ আজীবন ব্রহ্মচারী হন, তবে হে যমুনা, তুমি পথ করে দাও।'"
গোপীরা অবাক! তাঁরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করতে লাগলেন, "এ কেমন কথা? কৃষ্ণ তো আমাদের সঙ্গে রাসলীলা করেন, আমাদের স্বামী-ভাবের পতি। তিনি আবার ব্রহ্মচারী হলেন কবে?"
তবুও কৃষ্ণের ওপর বিশ্বাস রেখে তাঁরা যমুনার তীরে গিয়ে সেই মন্ত্র উচ্চারণ করলেন। আশ্চর্য! উত্তাল যমুনা দুভাগ হয়ে রাস্তা করে দিল। গোপীরা ওপারে গেলেন।
দুর্বাসা মুনির ভোজন
দুর্বাসা মুনি আশ্রমে ছিলেন। গোপীরা তাঁকে পরম আদরে ক্ষীর, মাখন, লুচি সব খাওয়ালেন। মুনি তৃপ্তিভরে সব খেলেন।
খাওয়া শেষে গোপীরা বললেন, "ঋষিবর, আমরা এখন ফিরব কী করে? যমুনা তো আবার ভরে গেছে।"
দুর্বাসা মুনি তখন বললেন, "তোমরা নদীর কাছে গিয়ে বলো— 'যদি দুর্বাসা মুনি কেবল দূর্বাঘাস খেয়েই উপবাসী থাকেন (অর্থাৎ কিছুই না খেয়ে থাকেন), তবে যমুনা পথ দাও।'"
গোপীরা এবার আরও বেশি অবাক! তাঁরা ভাবলেন, "এইমাত্র মুনিবর আমাদের চোখের সামনে হাড়ি হাড়ি সন্দেশ-ক্ষীর খেলেন, আর এখন বলছেন তিনি উপবাসী?"
কিন্তু ঋষির আদেশে তাঁরা যমুনার কাছে গিয়ে তাই বললেন। পুনরায় যমুনা পথ করে দিল।
জীব গোস্বামীর সমাধান (সুখবোধিনী’র শিক্ষা)
গোপীরা বৃন্দাবনে ফিরে এলেন, কিন্তু তাঁদের মনের খটকা গেল না। কৃষ্ণ কেন ব্রহ্মচারী? আর পেটভরে খেয়েও দুর্বাসা কেন উপবাসী?
এখানেই জীব গোস্বামী শেখালেন
কৃষ্ণ কেন ব্রহ্মচারী?
শ্রীকৃষ্ণ সাধারণ মানুষ নন। সাধারণ মানুষ ভোগের বাসনা নিয়ে স্ত্রী-সঙ্গ করে। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ 'আত্মারাম'—তিনি নিজের মধ্যেই পূর্ণ। গোপীদের সঙ্গে তাঁর মিলন কোনো লৌকিক কাম বা lust নয়, তা হলো চিম্ময় প্রেম বা divine love। তিনি আসক্তিহীন। পদ্মপাতায় যেমন জল লাগে না, তেমনই গোপীদের সঙ্গে থেকেও কৃষ্ণ জাগতিক বিকার-শূন্য। তাই তিনি নিত্য ব্রহ্মচারী।
দুর্বাসা কেন উপবাসী?
দুর্বাসা মুনি খাবার খেয়েছেন বটে, কিন্তু তিনি নিজের জিহ্বার স্বাদের জন্য খাননি। তিনি ভগবানকে নিবেদন করে প্রসাদ হিসেবে খেয়েছেন এবং গোপীদের ভক্তি গ্রহণ করেছেন। তাঁর মন খাবারে ছিল না, ছিল ভগবানে। তাই জাগতিক দৃষ্টিতে তিনি খেলেও, আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে তিনি অভুক্ত বা উপবাসী।---- শ্রী জীব গোস্বামী

0 Comments